ব্রেকিং নিউজ

গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে ঐতিহ্যবাহী আবু সিনা ছাত্রাবাস

  |  ০৯:৪৩, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

ডেইলি সিলেট মিডিয়াঃ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে দেড়শ বছরের পুরনো সিলেট নগরের ঐতিহাসিক স্থাপনা আবু সিনা ছাত্রাবাস গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন মহলের আন্দোলনের মুখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ঐতিহ্যবাহী আবু সিনা ছাত্রাবাসের একাংশ ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। কিন্তু একটি ইটও সংরক্ষণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন আন্দোলনকারী। তারা বলছেন এর মাধ্যমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিলেটবাসীর কাছে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী হিসেবে চিহ্নিত হবেন।

২৫০ শয্যার সিলেট জেলা হাসপাতাল নির্মাণের জন্য গত জুলাই মাসে এ স্থাপনা ভাঙার কাজ শুরু করে গণপূর্ত বিভাগ। বর্তমানে এই স্থাপনা পুরোপুরি ভেঙে ফেলে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য এখন পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে।

নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি রক্ষার দাবি জানানো হয়েছিল। এই দাবিতে ‘সিলেটের ঐতিহ্য রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ নাগরিক সমাজ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাংস্কৃতিক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আন্দোলনেও নেমেছিলেন।

পাশাপাশি নাগরিকদের আরেকটি অংশ ‘সিলেট উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের স্মারক সংরক্ষণ পরিষদ’ এর ব্যানারে ওই জায়গায়ই হাসপাতাল নির্মাণ এবং স্মারক হিসেবে আবু সিনা ছাত্রাবাসের একটি অংশ রক্ষার দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নামে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. এ কে আব্দুল মোমেন ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে আবু সিনা ছাত্রাবাসের একটি অংশ সংরক্ষণ করে হাসপাতাল করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি-আশ্বাস রক্ষা করেননি তিনি। এতে সংক্ষুব্ধ নাগরিকরা বলছেন- গায়ের জোরে ঐতিহাসিক এই ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।

সরেজমিনে সিলেট নগরের চৌহাট্টা এলাকার আবু সিনা ছাত্রাবাসে গিয়ে দেখা যায়, পুরো স্থাপনাটিই গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ইট-সুরকি সরানোর কাজ করছেন শ্রমিকরা। পাশাপাশি নতুন ভবন নির্মাণের জন্য পাইলিংয়ের কাজ চলছে।

সিলেট গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এই স্থানে ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতাল নির্মাণ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে ২০২০ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে সিলেট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কুতুব আল হোসাইন বলেন, হাসপাতাল ভবন নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে পুরনো স্থাপনা ভাঙার কাজ শেষ হয়েছে। ভবনের কোনো অংশ রাখার কোনো নির্দেশনা আমাদের ছিল না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা ছিল পুরো পুরানো ভবন ভাঙার। আমরা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ পালন করে এখন পাইল কাস্টিংয়ের কাজ করছি।

কুতুব আল হোসাইন বলেন, ২০২০ সালের জুলাই মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। যেহেতু কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে তাই আরেকটু সময় বেশি লাগবে সম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে। আশা করছি ২০২০ সালের জুলাই মাসের মধ্যে ৮০ ভাগ কাজ শেষ হয়ে যাবে। বাকি কাজ সম্পন্ন করতে সময় বাড়ানো হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মার্চ থেকে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনা ভেঙে হাসপাতাল নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরুর দিকে বিষয়টি সবার নজরে আসে। ‘সিলেটের ঐতিহ্য রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ নাগরিক সমাজ’ নামের সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এই স্থানে হাসপাতাল না বানিয়ে ভবনটি রক্ষার জন্য টানা ৩ মাস আন্দোলন করেন। এই দাবিতে নগরে বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচিও পালন করে সংগঠনটি।

এদিকে ‘সিলেট উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের স্মারক সংরক্ষণ পরিষদ’ নামের আরেকটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ঐতিহ্যবাহী এই ভবনের একাংশ সংরক্ষণ করে হাসপাতাল নির্মাণের দাবিতে নগরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন।

এ ব্যাপারে সিলেটের ঐতিহ্য রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ও জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাকির আহমদ বলেন, আমরা চেয়েছিলাম দেড়শ বছরের এই ভবন রক্ষা করতে। তাই আন্দোলনে নেমেছিলাম। আমাদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা উপলব্ধি করে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যখন শতবর্ষী ভবন রক্ষায় সম্মতি দিয়ে হাসপাতাল ভিন্ন জায়গায় সরিয়ে নেয়ার কথা বলেন তখনই একটি চক্র ভবনটি ভাঙতে ষড়যন্ত্র শুরু করে।

তিনি বলেন, এই চক্র কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ভবনটি মাত্র কয়েক লাখ টাকায় কিনে নেয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু আমাদের আন্দোলনে তাদের সেই লুটের সম্ভাবনা বাতিল হয়ে যাচ্ছে দেখে তারা দুইটি মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠীকে দুটি আলাদা প্ল্যাটফর্মে ভবনটি দ্রুত ভেঙে দেয়ার দাবি জানাতে আন্দোলনে নামায়। ভবনের একাংশ রক্ষার যারা দাবি জানিয়েছিল তারা মূলত পূর্ণাঙ্গভাবে ভবন ভাঙার চক্রের সঙ্গে জড়িত। যারা এই কাজ বাস্তবায়ন করেছেন তারা ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতার মর্যাদা দিতে জানেন না। তারা ইতিহাস, ঐতিহ্যের শত্রু।

এ বিষয়ে সিলেট উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের স্মারক সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক আল আজাদ বলেন, আমরা চেয়েছিলাম ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে ভবনটির একাংশ রক্ষা করে হাসপাতাল হোক। আমরা আশা করেছিলাম নানা স্মৃতি বিজড়িত এই ভবনের যে মিলনায়তন ছিল অন্তত সেটি রক্ষা করা হবে। এ ব্যাপারে আমাদের আশ্বাসও দিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু বাস্তবে ভবনের একাংশ রক্ষা করা হয়নি। তবে এ ভবনের স্মৃতির কথা ভেবে একাংশ রক্ষা করা উচিত ছিল।

শুরু থেকেই আবু সিনা ছাত্রাবাস ভবন রক্ষার দাবি জানিয়ে আসা বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, সিলেট নগরে প্রাচীন স্থাপত্যের অভাব। হাজার বছর পূর্বে গড়ে ওঠা এই নগরে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা বিভিন্ন কারণে হারিয়ে গেছে। এ অবস্থায় নগরের প্রাণকেন্দ্রে থাকা আসাম প্যাটার্নের এই দৃষ্টিনন্দন ভবন সংরক্ষণ করা সকলের দায়িত্ব ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক এই ভবনটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এই ভবন ভাঙার জন্য একটি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী দায়ী। আগামী প্রজন্মের কাছে এরা ঐতিহ্য ধ্বংসকারী হিসাবে নিন্দিত হবেন।

উল্লেখ্য, ১৮৫০ সালে সিলেট নগরের কেন্দ্রস্থল চৌহাট্টা এলাকায় ইউরোপিয়ান মিশনারিরা এই ভবনের প্রথম-পর্বের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত এই ভবন আসাম ও ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতির নান্দনিক স্থাপনা। এর সঙ্গে দুইটি বিশ্বযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের বুদ্ধিজীবী হত্যার স্মৃতি জড়িত। পুরাতন মেডিকেল ভবন বা আবু সিনা ছাত্রাবাস ভবন নামে পরিচিত এই ভবনটি এ অঞ্চলের ১৭০ বছরের বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মারক। সিলেট ভূকম্পপ্রবণ এলাকা হওয়ায় ১৮৬৯ ও ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে হাজার বছরের পুরনো বিভিন্ন শাসনামলের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়। টিকে থাকা হাতগোনা কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও বিনষ্ট হতে চলেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ