ব্রেকিং নিউজ

বেসিক ব্যাংকের ৬০ ভাগ ঋণই খেলাপি

  |  ০৬:৩৬, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

ডেইলি সিলেট মিডিয়াঃ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে বেসিক ব্যাংক। এই ব্যাংকটির ৬০ ভাগেরও বেশি ঋণ এখন খেলাপি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তৈরি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসিক ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৬০ দশমিক ৫০ শতাংশ খেলাপি। এর মধ্যে ৫৭ দশমিক ৭৩ শতাংশই মন্দ বা কুঋণ। এ বছরের জুন মাসের শেষে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৯ হাজার ১১৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এই ৯ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৮ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা হয়তো আর ফেরত পাওয়া যাবে না। কারণ, এগুলো এখন মন্দ ঋণের তালিকায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কেবল খেলাপি নয়, ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ৩ হাজার ৭৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘এক সময় বেসিক ব্যাংক নিয়ে গৌরব করা হতো। কিন্তু ব্যাংকটির পর্ষদে একজন বাজে লোককে চেয়ারম্যান পদে বসানোর কারণে এই ব্যাংকটি এখন সবচেয়ে খারাপ ব্যাংক হিসেবে পরিচিত হচ্ছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংকটিকে এই পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য ব্যাংকটির কর্মকর্তারাও দায়ী। তারা যদি নিয়ম মেনে ব্যাংকিং করতেন, তাহলে ব্যাংকটি এত খারাপ হতো না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটিকে বাঁচাতে এরইমধ্যে জনগণের করের কয়েক হাজার কোটি টাকা জোগানও দিয়েছে সরকার। তারপরও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটি। এছাড়া, বেসিক ব্যাংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এদিকে, বেসিক ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আলম ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আগামী ছয় মাসের মধ্যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ তথা এনপিএল (নন পারফর্মিং লোন) ৬০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

রফিকুল আলম আরও বলেন, ‘২০০৯ থেকে ২০১৪ সালে ব্যাংকে যারা অনিয়ম করেছেন, আমরা তাদের চিহ্নিত করেছি। এখন ওইসব ঋণ আদায়ের চেষ্ট চলছে।’ আগামী ছয় মাসে ১০টি লোকসানি শাখাকে লাভজনক করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। বর্তমানে ব্যাংকটির ৩৩টি লোকসানি শাখা রয়েছে।

অবশ্য সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বেসিক ব্যাংক পরিদর্শন করে ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। ওই দিন তিনি সাংবাদিকদের জানান, এক সময় বেসিক ব্যাংক ভালো ব্যাংক ছিল। অথচ ব্যাংকটি এখন তলানিতে পৌঁছেছে। এখন আপনাদের (কর্মকর্তাদের) সামনে দুটি অপশন আছে— চালু রাখা অথবা বন্ধ করা। সরকার ও দেশের জনগণ যেখানে মালিক, সেখানে কোনও প্রতিষ্ঠান বসে যাক, সেটা কেউ চাইবে না।

২০০৯ সালের আগে মডেল ব্যাংক হিসেবে মনে করা হতো বেসিক ব্যাংককে। তখন প্রতিবছর মুনাফা বেশি করায় ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও ছিল অন্য যেকোনও ব্যাংকের কর্মকর্তাদের চেয়ে বেশি। বেসিক ব্যাংকে চাকরি করাকে তখন গৌরবের মনে করা হতো। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের বেতন কমানোর জন্য বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে চেয়ারম্যান করে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেছিল সরকার। ওই সময় এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় কাজী ফখরুল ইসলামকে। ওই সময় থেকে মডেল এই ব্যাংকটিতে দুর্নীতি বাসা বাঁধতে থাকে। ২০১১ সাল থেকে ব্যাংকটির ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ পেতে থাকে। ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর সহায়তায় এই ব্যাংক থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়। অবশ্য ঘটনা ঘটার চার বছর পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়। প্রথমে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে বেসিক ব্যাংকের এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে শোকজ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।পরে ওই বছরের ২৯ এপ্রিল প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির দায়ে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে ভেঙে দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৪ সালের ২৫ মে এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। পরে বিতর্কিত চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এই বছরের জুন মাসের শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে (অবলোপন বাদে) প্রায় এক লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকেরই খেলাপি রয়েছে ৫৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩১.৫৮ শতাংশ।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ