ব্রেকিং নিউজ

ঢাকায় জনভোগান্তি চরমে

  |  ১৯:৩০, জুলাই ০৯, ২০১৯

ডেইলি সিলেট মিডিয়াঃ রাজধানীর প্রধান তিনটি সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের প্রতিবাদে রাজপথ বন্ধ করে চরম নৈরাজ্য করেছে হাতোগোনা কিছু রিকশাচালক ও মালিকরা। তারা সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এমনকি তারা সড়কে চলাচলরত বাস, সিএনজি অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ভাঙচুর করে। সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাতেগোনা কিছু রিকশাচালক ও মালিকের নৈরাজ্যে পুলিশ ও প্রশাসন ছিল রহস্যজনকভাবে নীরব। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা গেছে।

খিলগাঁও এলাকা থেকে রাজপথ বন্ধ করা শুরু হয়ে ক্রমে তা খিলগাঁও, মালিবাগ, রামপুরা, মানিকনগর, সায়েদাবাদ হয়ে আরও কয়েকটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রগতি সরণী বন্ধ হওয়ায় অন্যান্য সড়কে গাড়ির চাপ বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে পুরো রাজধানী যানজটের নগরীতে পরিণত হয়। এতে রাজধানীবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগিরা জানান, শুধু রাস্তা অবরোধ করেই ক্ষান্ত হয়নি রিকশাচালকরা, তারা বাস, সিএনজি অটোরিকশা, প্রাইভেটকারের যাত্রীদের লাঞ্চিতও করেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, কোটি মানুষকে জিম্মি করে রিকশাচালকদের এ ধরণের আন্দোলন গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি রিকশা চালকদের আলোচনায় বসার আহবান জানিয়েছেন। এদিকে, রিকশাচালকদের এহেন নৈরাজ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গেছে। বিশিষ্টজনদের মতে, রিকশাচালকদের এহেন আন্দোলনে নতি স্বীকার করলে ভবিষ্যতে সরকারের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে। একসময় তারা ভিআইপি রোড, এক্সপ্রেসওয়ে বা ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে চলাচলের দাবি করে বসবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রিকশাওয়ালাদের এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে কোটি টাকার টোকেন ও নম্বরপ্লেট বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্য করছে শ্রমিকলীগের ব্যানারে গড়ে ওঠা কমপক্ষে ৩০টি সংগঠন। এসব সংগঠন বৈধতার নাম করে প্রতি বছর কমপক্ষে ৪০ লাখ নম্বরপ্লেট ছাপিয়ে তা রিকশা মালিকদের কাছে বিক্রি করছে। প্রতিটি নম্বরপ্লেটের জন্য নেয়া হয় কমপক্ষে ৬০ টাকা করে। এ হিসাবে বছরে ২৪ কোটি টাকা ওঠে রিকশার নম্বরপ্লেট থেকে। এই নম্বরপ্লেট থেকে বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা হাতিয়ে নিচ্ছে কমপক্ষে ২ কোটি টাকা। রিকশা মালিকরা জানান, প্রধান সড়কে রিকশা বন্ধ হলে ধীরে ধীরে এই টোকেন ব্যবসা উঠে যাবে এ আশঙ্কা থেকেই নেতারা হাতেগোনা কিছু রিকশাচালককে আন্দোলনের নামে রাস্তায় নামিয়েছে। ঢাকা শহরের উন্নতিতে তাদের কিচ্ছু আসে যায় না।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, প্রধান তিনটি সড়কে রিকশা বন্ধের প্রতিবাদে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডাসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে রিকশা চালক ও মালিকরা। এক পর্যায়ে তারা কুড়িল বিশ্বরোড থেকে প্রগতি সরণী হয়ে রামপুরা-মালিবাগ পর্যন্ত রাস্তা একেবারে বন্ধ করে দেয়। শুধু তাই নয়, তারা ওই সময়ে সড়কে চলাচলরত যানবাহনের উপর হামলা করে। টেনে ভেঙ্গে ফেলে প্রাইভেট কারের বাম্পার, সিএনজি অটোরিকশার সামনের কাঁচ। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগিরা জানান, হাতে গোনা তিছু রিকশা চালক আন্দোলনের নামে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয় মোটরসাইকেল চলতেও বাধা দেয়। এতে করে এক পর্যায়ে প্রগতি সরণীতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। হাতিরঝিল থেকে ইউলুপ দিয়ে বাড্ডা প্রবেশকালে শত শত গাড়ি আটকা পড়ে। একই সাথে রামপুরা থকে মালিবাগ হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত শত শত গাড়ি আটকে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়।

ভুক্তভোগি কয়েকজন যাত্রী জানান, সকাল ১০টার পর মালিবাগে একই স্থানে প্রায় দুই ঘণ্টা যানবাহন একেবারে ফ্রিজ হয়ে ছিল। গরমে তখন হাজার হাজার যাত্রীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেকেই উপায় না দেখে পায়ে হেঁটে রওনা করতে বাধ্য হয়। কিন্তু মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ বা যাদের সাথে ভারি মালামাল ছিল তারা পড়েন চরম বিপাকে। শুধু তাই নয়, সকালে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা চরম বিপাকে পড়ে। সাংবাদিকদের কাছে তারা ক্ষোভও ঝেড়েছেন। একজন শিক্ষার্থী বলেন, সরকার সবার সুবিধার জন্যই প্রধান সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ করেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে। অথচ কিছু রিকশাচালক এর প্রতিবাদে রাস্তা বন্ধ করবে-এটা কেমন কথা। দেশটা কি মগের মুল্লুক? একজন অভিভাবক বলেন, হাতেগোনা কিছু রিকশা চালক রাস্তা বন্ধ করে দিল আর পুলিশ তা বসে বসে দেখল? এতো মানুষের দুর্ভোগের কথা পুলিশ একবারও চিন্তা করলো না। দু’শ রিকশাচালককে রাস্তা থেকে সড়ানোর জন্য কতো জন পুলিশ লাগে? আরেক অভিভাবক বলেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আমাদের ছেলে মেয়েরা যখন রাস্তায় নেমেছিল তখন তো পুলিশ টিয়ারগ্যাস এমনকি গুলি করতেও দ্বিধা করেনি। এখন পুলিশ কেন নীরব? প্রশাসন কি করছে সাধারণ মানুষের জন্য। এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, হাজারো রাস্তার মধ্যে মাত্র দুটি প্রধান সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ করা হয়েছে নাগরিকদের জন্যই। লক্ষ-কোটি মানুষকে জিম্মি করে এ ধরনের আন্দোলন গ্রহণযোগ্য নয়। মেয়র বলেন, সরকারের সব সিদ্ধান্ত নাগরিকদের পছন্দ নাও হতে পারে। তবে আলাপ-আলোচনর মাধ্যমে তা সমাধান করা সম্ভব।

এদিকে, সকালে প্রগতি সরণীসহ রাজধানীর প্রধান কয়েকটি সড়ক বন্ধ হয়ে লাখ লাখ মানুষ যখন ভোগান্তিতে তখন রিকশাচালকরা ছিল নাচ গান ও খেলায় মত্ত। রাজধানীর খিলগাঁও, মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, নতুন বাজার এলাকা ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।

সরেজমিন দেখা যায়, জনগণের দুর্ভোগ রিকশাচালকদের কাছে তুচ্ছ বিষয় ছিল। তারা রাস্তা বন্ধ করে বিনোদনে মেতে উঠে। আন্দোলনের নামে রাস্তায় তাদের কেউ ফুটবল খেলেছে, কেউ তাস খেলেছে, কেউ কেউ আবার নাচ-গান নিয়ে ব্যস্ত ছিল। একদিকে তাদের উল্লাস চলে অন্যদিকে যান চলাচল বন্ধ থাকায় ভ্যাপসা গরমের মধ্যে পথচারীদের পায়ে হেঁটে নিজ নিজ গন্তব্যে চলতে দেখা যায়। রামপুরা এলাকায় রাস্তায় বাঁশ ফেলে উভয়দিকের যান চলাচল বন্ধ করে দেয় রিকশাচালকরা। এসময় ফাঁকা রাস্তায় তারা ফুটবল ও তাস খেলায় মেতে উঠে।

একটি বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তার গাড়ি চালক ইমরান হোসেন বলেন, আমি আমার স্যারকে প্রতিদিন ১১টায় অফিসে দিয়ে আসি। আজ রাস্তা বন্ধের কারণে সাড়ে ১২টা বেজে গেছে এখনও রামপুরায় রয়ে গেছি। গাড়ি চলছে না, এতে আমার চাকরি থাকবে কিনা জানি না।

একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নাদিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, মেয়েকে স্কুলে দিয়ে এসেছি ভোরে। মেয়ের স্কুল ছুটি হয়েছে কিন্তু এখনও স্কুলে যেতে পারেনি। গাড়ি পাচ্ছি না, রিকশাচালকরা আন্দোলন করছে, কি করবো কিছুই ভাবতে পারছি না। অন্যদিকে, প্রগতি সরণীর প্রভাবে গতকাল দুপুরে ঢাকার মিরপুর রোড, বিমানবন্দর রোড, মগবাজার, গাবতলী, নিউমার্কেট, ফার্মগেইট, মতিঝিল, শাহবাগ, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিসহ আশপাশের এলাকায় গাড়ির চাপ বেড়ে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়। তাতে লাখো কোটি মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

সোহরাব নামে আন্দোলনকারী এক রিকশাচালকের বক্তব্য, জনগণকে দুর্ভোগে ফেলা আমাদের লক্ষ্য না। আমাদের রাস্তায় চলতে বৈধতা দেওয়ার কারণে আমরা ঢাকা শহরে এসে রিকশা চালাই। আমাদের পরিবারও সঙ্গে থাকে। এখন হঠাৎ করে আমাদের রিকশা চালাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা এখন কি খাবো, পরিবারকে কেমন করে চালাবো।

এদিকে, মূল সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করলে আজ বুধবার সকাল থেকে ফের রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে নামার ঘোষণা দিয়েছে রিকশাচালকরা। গতকাল বিকেলে এ ঘোষণা দেয় রিকশা-মালিক নিবন্ধিত ছয়টি সংগঠনের সমন্বয় পরিষদ। পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক বাবুল হোসেন বলেন, আমাদের দুটি দাবি না মানলে আমরা আজকের মতো কালও রাজপথে থাকব। এ পরিষদের সদস্যরা সকাল থেকে যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ এলাকায় থাকবে। রিকশাচালক-মালিক ও গ্যারেজ মালিকরা আমাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।

জাতীয় রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইনসুর আলী বলেন, আমরা সড়কে নেমে আন্দোলন করছি না। চালক ও মালিকরা বিচ্ছিন্নভাবে সড়ক অবরোধ করছে। আমরা বৃহস্পতিবার প্রেস ক্লাবে একটি মহাসমাবেশ করব। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি নিয়ে যাবো। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের রিকশা মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ-সম্পাদক মো. মমিন আলী বলেন, আমরা চাই সড়কে ব্যাটারিযুক্ত রিকশা চালানো বন্ধ করে মূল সড়কে বৈধ রিকশা চলাচল করতে দেয়া হোক। এছাড়া যানজট নিয়ন্ত্রণে সড়কের বাম দিকে রিকশার জন্য আলাদা লেন করে দিতে হবে। এ বিষয়ে আমরা রোববার প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেব।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ